তবে এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও প্রবৃদ্ধির বিপরীতমুখী ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। বিদায়ী অর্থবছরে দেশের মোট রফতানি আয় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কমলেও বেপজাধীন জোনগুলো থেকে রফতানি বেড়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে জাতীয় রফতানি আয়ে সংস্থাটির অবদান দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ চুক্তি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও রেকর্ড গড়েছে বেপজা।
জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সামগ্রিক রফতানি কিছুটা হ্রাস পেলেও বেপজাধীন জোনগুলো রফতানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে। এ সময়ে দেশের মোট রফতানি আয় হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে বেপজাধীন জোনগুলো থেকেই রফতানি হয়েছে ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য, যা দেশের মোট রফতানির ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট রফতানি ছিল ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বেপজার অংশ ছিল ৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। সেই তুলনায় বিদায়ী অর্থবছরে দেশের সামগ্রিক রফতানি যেখানে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, সেখানে বেপজার রফতানি ২ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব ও লিজ চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে রেকর্ড মাইলফলক অর্জন করেছে বেপজা। এ সময়ে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সামোয়া ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের মোট ৩৬টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের লক্ষ্যে সংস্থাটির সঙ্গে লিজ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ৭১৭ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার, যা বেপজার ইতিহাসে একক অর্থবছরে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ প্রস্তাব। নতুন চুক্তিবদ্ধ এ প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ উৎপাদনে গেলে জোনগুলোয় ৭৫ হাজার ৭৪৪ জন বাংলাদেশী নাগরিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এদিকে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই প্রথাগত পণ্যের বাইরে গিয়ে বৈচিত্র্যময় পণ্য নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাগ ও লাগেজ, ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ, টেক্সটাইল, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস পণ্য, ব্লুটুথ হেডফোন, এয়ারপ্লেন অ্যামিনিটি ব্যাগ অ্যান্ড কিট, খেলনা ড্রোন বা মাছ ধরার ড্রোন ও কম ওজনের পণ্য পরিবহনের ড্রোন, জুতা ও জুতা তৈরির অ্যাকসেসরিজ, তাঁবু ও তাঁবু তৈরির অ্যাকসেসরিজ, চামড়াজাত পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, ক্যাম্পিং ফার্নিচার, গ্রিনহাউজ হাইড্রোপনিকস টেন্ট, কৃষিজাত পণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী এবং গৃহস্থালি পণ্য।
দক্ষ ব্যবস্থাপনা, জোন পরিচালনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও দ্রুত বিনিয়োগকারীদের সেবা প্রদানের বেপজা দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এর সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত চীনের বিখ্যাত খাইশি গ্রুপ। প্রথম প্রতিষ্ঠান খাইশি লিনজারে বাংলাদেশে ৬০ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। পরে গত বছর দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান খাইশি গার্মেন্টস বাংলাদেশের মাধ্যমে আরো ৪০ দশমিক শূন্য ৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
চলতি মূলধন ব্যতীত কেবল মূলধনি যন্ত্রপাতি, নির্মাণসামগ্রী এবং অন্যান্য সম্পদ বাবদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেপজাধীন জোনগুলোয় প্রকৃত বিনিয়োগ এসেছে ২৮৬ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই ’২৫ হতে মার্চ ’২৬ পর্যন্ত) বেপজার এফডিআই নেট ইনফ্লোর পরিমাণ ছিল ২২১ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট এফডিআই নেট ইনফ্লোর ১৯ দশমিক ৬১ শতাংশ।
দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ ও দক্ষ জনশক্তি গঠনে বেপজা তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেপজাধীন জোনগুলোয় নতুন করে ২৫ হাজার ১৬৪ জন বাংলাদেশীর কর্মসংস্থান হয়েছে। ফলে জুন ২০২৫-এ যেখানে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৫২৭, জুন ২০২৬ শেষে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯১ জনে, যা এ-যাবৎকালের সর্বোচ্চ।
পণ্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে বেপজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে চালু থাকা ৪৫১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৩ শতাংশ তৈরি পোশাক, ১৮ শতাংশ গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ এবং ৮ শতাংশ টেক্সটাইল পণ্য রফতানি করছে। বাকি ৪১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বৈচিত্র্যময় পণ্য রফতানি করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। এছাড়া বেপজাধীন জোনগুলোয় উৎপাদিত পণ্য বিশ্বের ১২৯টি দেশে রফতানি হয়েছে, যা বেপজার সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রমাণ করে।
বেপজা বর্তমানে আটটি ইপিজেড এবং বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালনা করছে। জুন পর্যন্ত জোনগুলো মোট বিনিয়োগ এসেছে ৭ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার এবং মোট রফতানি হয়েছে ১২৭ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। বর্তমানে বেপজার অধীনে মোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৬৬। এর মধ্যে ৪৫১টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং ১১৫টি বাস্তবায়নধীন রয়েছে।